ঢাকা:
বাংলাদেশের ইতিহাসে জুলাই ২০২৪ ছিল এক অস্থির, ঘটনাবহুল ও স্মরণীয় মাস। কোটা সংস্কারকে ঘিরে ছাত্র জনতার তীব্র আন্দোলন, ভয়াবহ সংঘর্ষ এবং নজিরবিহীন ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের কারণে পুরো দেশ কার্যত স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। সরকারের কড়া অবস্থান এবং জনগণের প্রতিরোধ—এই দুইয়ের টানাপোড়েনে তৈরি হয় এক উত্তাল সময়। আর সাধারণ মানুষ? তারা ছিলেন মধ্যখানে—ভয়, সীমাবদ্ধতা ও হতাশার মধ্যে।
মাসের ঘটনাপঞ্জি এক নজরে:
১–৭ জুলাই:
উত্তরের জেলাগুলোয় ভারী বর্ষণ ও বন্যায় অন্তত ৮ জনের মৃত্যু হয়। হাজার হাজার মানুষ আশ্রয়হীন হয়ে পড়ে। সাহায্যের অভাবে অনেকেই খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও ওষুধ সংকটে ভোগেন।
৮–১৫ জুলাই:
কোটা সংস্কারের দাবিতে রাজপথে নামে দেশের ভবিষ্যৎ—বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী। কিন্তু আন্দোলন চলাকালেই সাধারণ মানুষের মাঝে ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক। বাস, ট্রেন, এমনকি রিকশা চলাচলও ব্যাহত হয়। অনেক এলাকাতে বন্ধ হয়ে যায় দোকানপাট, মানুষের আয়-রোজগার থমকে দাঁড়ায়।
১৬–১৮ জুলাই:
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় সংঘর্ষের পরপরই রাজধানীতে জরুরি অবস্থা সদৃশ পরিস্থিতি তৈরি হয়।শহরের বিভিন্ন এলাকায় পুলিশের চেকপোস্ট, বিক্ষোভকারীদের খোঁজে ধরপাকড়—এ সবই জনমনে উদ্বেগ বাড়ায়। বাবা-মা সন্তানদের বাইরে পাঠাতে ভয় পাচ্ছিলেন।
১৮–২৮ জুলাই:
সরকার ইন্টারনেট ও মোবাইল সংযোগ বন্ধ করে দেয়। এতে দেশের কোটি কোটি মানুষ কার্যত তথ্যবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। শিক্ষার্থীরা অনলাইনে ক্লাস করতে পারেনি, রোগীরা ডাক্তারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেনি, ব্যবসায়িক কার্যক্রম থমকে যায়। হাজারো মানুষ বিকাশ, নগদ, ব্যাংকিং অ্যাপ বন্ধ থাকায় আর্থিক বিপর্যয়ে পড়ে।
২১–২২ জুলাই:
“জুলাই গণহত্যা” স্মরণে যাঁরা ঘরে বসে প্রার্থনায় অংশ নিতে চেয়েছেন, তাঁরাও ভয় পেয়েছেন—এই বুঝি আবার ইন্টারনেট বন্ধ হয়ে যায়, কারো ফোন ট্র্যাক করা হয়, কেউ গ্রেপ্তার হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্বাধীন মত প্রকাশে স্পষ্ট একটা আতঙ্ক বিরাজ করছিল।
জনজীবনে সেই সময়কার প্রতিচ্ছবি:
একজন দোকানদার (মজনু মিয়া): কাস্টমার নাই, বিকাশ বন্ধ, কেউ জিনিস কিনে না। দোকান চালিয়ে থাকা অসম্ভব হয়ে গেছে।”
একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী (সাইফ ওমর): “সারাদিন ইন্টারনেট বন্ধ, বাড়িতে ফোনও কাজ করে না। ভয় লাগছে, জানিই না বাইরে কী হচ্ছে।”
একজন গৃহবধূ (সাফিয়া খানম): “টিভিতে কিছু বলছে না, ফেসবুকেও কিছু দেখা যায় না। মনে হচ্ছিল, দেশের ভেতরেই আমরা বন্দি।”
বিশ্লেষণ:
জুলাই ২০২৪ আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছে—শুধু রাজনৈতিক নীতির প্রশ্ন নয়, মানবিক দিকেও গুরুত্ব না দিলে সাধারণ মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। জনগণের কথা বলার অধিকার, তথ্য জানার অধিকার, ও নিরাপত্তা পাওয়ার অধিকার—এই তিনটি সংকুচিত হলে দেশ একটি অদৃশ্য শৃঙ্খলে বন্দি হয়ে পড়ে।
– দৈনিক বড়দিগন্ত

১৬.৬৬°সে